নিজস্ব প্রতিবেদকঃঃ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি ইউনিয়ন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত এক অপূর্ব পর্যটন গন্তব্য। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে যায় রাতের অন্ধকারে। সীমান্তঘেঁষা দমদমা এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ চোরাচালান নেটওয়ার্ক, যা ধীরে ধীরে একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পণ্য পরিবহনের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের কাপড়, কসমেটিকস, বিদেশি সিগারেট, গবাদিপশু এবং মাদকদ্রব্য। নদীপথ ও দুর্গম গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে দ্রুত এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু মধ্যস্থতাকারী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রভাবশালী মহলের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালিত হলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে কিছু ব্যক্তি ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে অর্থ আদায় করছে। স্থানীয়দের মতে, এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের কারণে চোরাচালান কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সহজ আয়ের আশায় অনেক তরুণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ডেকে আনছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সহিংস ঘটনার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। চোরাকারবারিদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
চোরাচালানের পাশাপাশি পিয়াইন নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও সামনে এসেছে। পরিবেশবিদদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি এলাকা, নদীপথ এবং সীমান্তের জটিল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হচ্ছে, স্থানীয়দের দাবি বাস্তব পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন এখনও সীমিত।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, জেলা পুলিশের নির্দেশনায় সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা নয় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা এবং সীমান্তবাসীর জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। অন্যথায় দমদমা সীমান্ত ক্রমেই অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের আশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে সীমান্ত এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
Leave a Reply